নিজস্ব প্রতিবেদক : গাজীপুরের শ্রীপুরের একটি রিসোর্টে আলোচিত গণধর্ষণ মামলাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ভুক্তভোগী এক মডেল-অভিনেত্রী প্রথমে ধর্ষণের অভিযোগ করলেও পরবর্তী সময়ে দেওয়া একাধিক বক্তব্যে গড়মিল ধরা পড়েছে। বিশেষ করে, ঘটনার সঙ্গে ‘আইফোন’ প্রসঙ্গ যুক্ত হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে বিভ্রান্তি ও কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
অভিযান ও আটক :
গত শনিবার দুপুরে শ্রীপুর উপজেলার উত্তর পেলাইদ গ্রামের রাস রিসোর্টে সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. সাইদুল ইসলামের নেতৃত্বে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। নিবন্ধনবিহীনভাবে রিসোর্ট পরিচালনার দায়ে বাংলাদেশ হোটেল ও রেস্তোরাঁ আইন, ২০১৪-এর আওতায় দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।অসামাজিক কার্যকলাপের অভিযোগে অভিযান চালিয়ে রিসোর্ট থেকে দুই নারী ও কয়েকজন স্টাফসহ ১৮ জনকে আটক করে পুলিশ। এর মধ্যে চারজনকে মানবপাচার মামলায় পাঠানো হয়েছে। অন্যদিকে গাজীপুর সাফারি পার্কে অনুপ্রবেশ ও রাজনৈতিক মামলাসহ সর্বমোট ৪০ জনকে আদালতে পাঠানো হয়।
ধর্ষণ মামলা :
ভুক্তভোগী নারী শ্রীপুর থানায় মামলা করেন নাট্যনির্মাতা নাসির উদ্দিন, বাবর ও এক অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির বিরুদ্ধে। তার অভিযোগ অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার ভোররাতে তিনি ঢাকার বাসা থেকে পরিচালক নাসির উদ্দিনের সঙ্গে রিসোর্টে পৌঁছান। সেখানে মদপানরত কয়েকজনকে দেখতে পান। পরে কক্ষে নিয়ে গিয়ে পর্যায়ক্রমে তিনজন তার সঙ্গে জোরপূর্বক শারীরিক সম্পর্ক করেন। পরে সকালে তাকে গাড়িতে করে ঢাকায় পৌঁছে দেওয়া হয়। বাসায় দুই দিন চিকিৎসা শেষে তিনি প্রথমে মিরপুর থানায় গিয়ে অভিযোগ করেন, পরে শ্রীপুর থানায় মামলা রেকর্ড হয়।
ভুক্তভোগীর ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য :
এখানেই ঘটনার মোড় ঘুরে যায়। এক সময় ভুক্তভোগী নারী বলেন আমার সঙ্গে যা হয়েছে তাতে কষ্ট নেই, সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয়েছে আমার আইফোন নিয়ে গেছে বলে। আবার দুই সাংবাদিককে আলাদাভাবে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, একজন ৬০ বছরের বৃদ্ধ এবং আবার ৭০ বছরের বৃদ্ধ তাকে ধর্ষণ করেছেন। অপর এক বক্তব্যে তিনি উল্লেখ করেন, ওই বৃদ্ধ ব্যক্তি তাকে বেশি সময় কষ্ট দিয়েছেন।
শ্রীপুর থানার এক এসআই জানান, থানায় প্রথমে এসে ওই নারী মূলত আইফোন হারানোর অভিযোগই তুলেছিলেন।
প্রশ্ন ও বিতর্ক :
ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার ঝড় ওঠে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, রাত সাড়ে তিনটার সময় কেন তিনি ঢাকার বাসা থেকে গাজীপুরের একটি রিসোর্টে গেলেন? স্থানীয়দের মতে, “আসল ঘটনা লেনদেনের বনিবনা না হওয়া।” কেউ কেউ বলেছেন, আইফোন যদি সত্যিই নিয়ে থাকে তবে কাগজপত্র দেখে সেটি উদ্ধার করা হোক। আবার কাগজপত্র না থাকলে ঘটনার পেছনে কী আছে তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
প্রশাসনের অবস্থান :
সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. সাইদুল ইসলাম জানিয়েছেন,
মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে শুধু রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। কাউকে আটক করা হয়নি। শ্রীপুর থানার ওসি আব্দুল বারিক বলেন, অনৈতিক কাজে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে মোট ১৮ জনকে আটক করা হয়। এর মধ্যে দুই নারীসহ চারজনকে মানবপাচার মামলায় এবং বাকিদের সন্দেহভাজন হিসেবে আদালতে পাঠানো হয়েছে। ধর্ষণের অভিযোগে মামলা রেকর্ড করা হয়েছে এবং আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
পরিশেষে :
গাজীপুরের এই ঘটনাটি শুধু ধর্ষণ মামলা নয়, বরং ভুক্তভোগীর পরস্পরবিরোধী বক্তব্য, আইফোন হারানোর অভিযোগ এবং রিসোর্টে অসামাজিক কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তদন্তের অগ্রগতিই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে এটি সত্যিকারের গণধর্ষণ নাকি অন্য কোনো ঘটনার আড়ালে সাজানো নাটক।